সভ্যতার সংঘাত

ক্ষমতা চর্চার ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীতে আধিপত্যবাদী আমেরিকার প্রায়োরিটি লিস্ট ছিল অনেকটা এরকম-

√ ইউরোপ

√ উত্তর-পূর্ব এশিয়া

√ মধ্যপ্রাচ্য

.

ইউরোপীয় অর্থনীতির অধঃপতন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীন-ভারতের প্রাবল্য, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের ডিফায়েন্ট অবস্থান, আফগানিস্তানে বিশুদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের  ধারার উত্থান, মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোলের উপর নির্ভরতা-সহ নানাবিধ কারণে একবিংশ শতাব্দীতে তালিকাটি পরিবর্তন হয়ে এমন দাঁড়ায়-

√ উত্তর-পূর্ব এশিয়া

√ মধ্যপ্রাচ্য

√ ইউরোপ

.

কিন্তু, ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘ ও তীব্র যুদ্ধে অর্থনৈতিক সংকট এবং সামরিক-রাজনৈতিকভাবে অপদস্থ হওয়ার  ২০০৮ সাল আসতে আসতে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান আধিপত্য মোটামুটি নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে গোটা এশিয়াতে আমেরিকার নূন্যতম অস্তিত্ব টিকে আছে কেবল- সৌদি আরব, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো নতজানু,রাস্ট্রগুলোর বদৌলতে।

.

এশিয়াতে নিজের আধিপত্য বিস্তারে চরমভাবে ব্যার্থ হয়ে অন্তত ইউরোপে নিজেদের দাপট প্রমাণে আমেরিকার নের্তৃত্বাধীন পশ্চিম ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটো(NATO) বুখারেস্ট সম্মেলনে পূর্ব ইউরোপের দেশ থাকা  ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে নিজেদের সাথে একীভূত করার ঘোষণা দেয়। উল্লেখ্য, ইউক্রেন ও জর্জিয়া দুটি দেশই ইতিপূর্বে সোভিয়েত রাশিয়ার অংশ ছিল।

.

অথচ, ১৯৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রাক্কালে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধাণ গর্বাচেভকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ন্যাটো পুবদিকে মানে রাশিয়ার দিকে এক ইঞ্চিও এগুবে না। অথচ স্রেফ নব্বই দশকেই মাথায় এগুতে এগুতে সারা পূর্ব ইউরোপকে কব্জা করে নিয়েছে। দশ বছরে একে একে ন্যাটোভুক্ত করে নেয় এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, আলবেনিয়া, স্লোভাকিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়াকে। 


অতঃপর, এদেশগুলোতে আমদানী করা হয় পশ্চিমা আমেরিকান লিবারেল মূল্যবোধ। যেন গোটা ইউরোপে আমেরিকার আদর্শিক ও রাজনৈতিক তথা নিরংকুশ আধিপত্য কায়েম হয়ে যায়।

.

★প্রশ্ন হলো তখন রাশিয়া তা করতে দিল কেন? 

উত্তর হলো- রাশিয়া তখন ছিল অসহায়, পঙ্গু। 


কিন্তু, ২০০৮ সালে আমেরিকা ও ন্যাটোর অবস্থান অনেকটাই দুর্বিষহ। আর রাশিয়াও কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ইসলামী বিপ্লব থেকে তারা শিক্ষাগ্রহণ করেছে ইতিমধ্যেই আমেরিকার মিডিয়া ও প্রযুক্তিকে তাদের বিরুদ্ধেই কাজে লাগানো সম্ভব এবং আমেরিকা-ন্যাটোর সেনারা সম্মুখ সমরে নারী ও শিশুদের চেয়েও অক্ষম।


জর্জিয়া ও ইউক্রেনের মতো ভৌগোলিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদী শক্তি থেকে মুক্ত রাখতে, রাশিয়া নিতান্তই খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে জর্জিয়া আক্রমণ করে বসে এবং ন্যাটোর সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দেয়। ২০১১ সালে রাশিয়ান প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ তার সেনা কর্মকর্তাদের বলে-

 "If you ... had faltered back in 2008, the geopolitical situation would be different now," 

"যদি ২০০৮ সালে আপনারা পিছিয়ে পড়তেন, তবে আজ ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন রকমের হতো।"

.

দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পর পূর্ব ইউরোপেও আমেরিকা-ন্যাটোর পরিকল্পনা ব্যার্থ হওয়ার পর আমেরিকা নিজেদের সম্মান পুনরুদ্ধারে নতুন করে ছক কষতে বসে। প্রাথমিকভাবে ২০১১ তে আরব বসন্তের সময় কিছুটা সফলতা চোখে দেখলেও সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়াতে সবকিছুই তাদের হাত ফস্কে বেড়িয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়াতে স্বপ্নভঙ্গের পর, আবার ইউরোপে মনোযোগ ফিরিয়ে আনে আমেরিকা। 

.

অতঃপর ২০১৪ সালে তারা একবিংশ শতাব্দীর 'প্রথম' সফলতা দেখতে পায়! ইউক্রেনে পশ্চিমা লিবারেল গোষ্ঠী অভ্যুথান ('অরেঞ্জ রেভ্যুলেশন') ঘটিয়ে  ২২ফেব্রুয়ারি/২০১৪ তে পশ্চিমাবিরোধী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে অপসারণ ঘটায়। অতঃপর, লোক-দেখানো নির্বাচন আয়োজন করে কট্টর আমেরিকাপন্থী সরকারকে ক্ষমতায় বসায়।

.

পূর্ব ইউরোপে ইউক্রেনকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা-ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণ ও আধিপত্য ঠেকাতে, অভ্যুথানের মাস খানেকের মাথায় রাশিয়া ১৮ মার্চ/২০১৪ তে ক্রিমিয়া দখল করে বসে।

আবারো চপেটাঘাতের শিকার হয় আমেরিকা-ন্যাটো জোট। 

.

ইউরোপে আবারো নাজেহাল হয়ে পুনরায় এশিয়াতে মনোযোগ দেয় আমেরিকা। কিন্তু, বরাবরের মতই সিরিয়া, হংকং ও আফগানিস্তানে আমেরিকা আবারো প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত হয়। উত্তর কোরিয়া ও ইরানেও তাদের পরিকল্পনা কাংখিত ফলাফল আনতে অসমর্থ হয়।

.

কিন্তু, ক্ষমতার নেশায় উন্মাদ আমেরিকা-ন্যাটো জোট যেন নিজেদের কবর খুঁড়েই ক্লান্ত নয়। বরং, কেমন যেন তারা সংকল্পবদ্ধ যে- নিজেদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেই তারা ক্ষান্ত হবে।


আবারো, ইউক্রেন ইস্যুতে ফেরত আসে তারা। তারা বুঝতেই চায়নি যে-

 ১) আমেরিকান লিবারেল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আদর্শিক আগ্রাসন,

 ২) ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক প্রাবল্য এবং 

৩) ন্যাটোর সম্প্রসারণবাদী নীতি কোনো জাত্যাভিমানী নেতা মেনে নিতে পারেনা।


 নব্বই দশকের দুনিয়া আর ২০২২ এর দুনিয়া এক নয়। পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়া বা আরবের শাসকদের মতো সবাই হবার না।

.

শেষ পর্যন্ত, ২০২১ সালে আফগানিস্তানে পতন নিশ্চিত হওয়ার প্রাক্কালে, আমেরিকা-ন্যাটো নিজেদের প্রভাব প্রদর্শনে ইউক্রেনকে আবারো ন্যাটোভুক্ত করার চেষ্টা করতেই রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে বসে। সে যুদ্ধ এখন চলমান। 


ফলাফল ও পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত রাশিয়ার অনুকূলেই। নিজদের প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল সরবরাহ এবং গ্যাসের জন্য ইউরোপের রাশিয়া-নির্ভরতা এযুদ্ধে বড় নিয়ামক। ডলারের বিকল্প হিসেবে অন্যান্য মুদ্রার চল অল্প পরিসরে হলেও শুরু হয়ে গেছে, যা ছিল দুনিয়াব্যাপী আমেরিকান আধিপত্যের অন্যতম হাতিয়ার।


একদম সম্প্রতি রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্ব অংশের, সীমান্তবর্তী চারটি প্রদেশ নিজ দেশের অংশ করে নিয়েছে। বিপরীতে, আমেরিকা-ন্যাটো জোট কিছু স্যাংশন আরোপ করেই ক্ষান্ত হয়েছে। সম্ভবত ইউক্রেনকে জর্জিয়ার মতো এলোমেলো ও সন্ত্রস্ত করেই রাশিয়া এযুদ্ধের ইতি টানবে। সাময়িকভাবে ইইউয়ের অংশ হতে দিলেও এবং বাল্টিক রাস্ট্রগুলোতে ক্রমাগত নিজেদের আদর্শিক, রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে থাকবে। আর এটাই ইতিহাসের কথা যে- বিজয়ী শক্তির আনুগত্যই করা হয়।

.

এখন পশ্চিমা লিবারেল তোতাপাখিরা বলছে- আগে পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোকে যেভাবে ন্যাটোভুক্ত হতে দেয়া হয়েছে , ইউক্রেনকে সেভাবে হতে দিলে তো যুদ্ধ হতো না। মানুষ বাঁচতো এবং রাশিয়া ‘সভ্য’ দুনিয়ার সদস্য হিসেবে ইউরোপীয় মূল্যবোধের অংশীদার থাকতো।

এখানে এক সোভিয়েত ফেরত লেখক শাহাব আহমদের বিশ্লেষণ প্রাসঙ্গিক হবে-

.

"এই যে (লিবারেল) ‘ইউরোপীয় মূল্যবোধ’ নিয়ে এত ট্রাম্পেট বাজানো হয়, তা আসলে কী?

.

আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে এনে দাস হিসেবে বিক্রি করা এবং সারাদুনিয়াব্যাপী দেশের পরে দেশ দখল করে অমানবিক শোষণ নিপীড়ন যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে কোটি কোটি মানুষ হ*ত্যা করা এবং মুখে মুখে গণতন্ত্রের যপ করা। 

ইউরোপীয় মূল্যবোধের ঝুরিতে আছে দু দুটি মহাযুদ্ধ, যারা শত শত বর্ষ ধরে নিজেরা নিজেরা মারামারি করে তৈরি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন  এবং একে অন্যের টুঁটি চেপে ধরছে।

.

মুক্তচিন্তার কিছু মহান মানুষ ও শিল্প সাহিত্য দর্শন ও বিজ্ঞানের কিছু মহৎ সৃষ্টি ছাড়া (যারা নিজেরাও ইউরোপে ছিল নিঃস্ব, নিপীড়িত, নিগৃহীত ও নিহত) ইউরোপ পৃথিবীকে কী দিয়েছে? হিংসা ও ক্লেদ, যেখানে প্রাচ্য দিয়েছে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, ধর্ম ও শান্তির দর্শন। রাশিয়া ইউরোপীয় মূল্যবোধের অংশ নয়, কোনওদিন ছিল না।"

(শাহাব আহমদের উদ্ধৃতি সমাপ্ত)

.

পরিশেষে বলা যায় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইসলামপন্থীদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। 

রাশিয়া এযুদ্ধকে বলছে পশ্চিমা নব্য-লিবারেল সভ্যতার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম। এসংঘাত স্রেফ রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য নয়।

এবং স্লাভো জিজেকের একথাটি কিছুটা হলেও বিবেচনার দাবী রাখে-

Sooner or later, it will have to make a choice. Will it be truly European, by participating in the universal emancipatory project that defines Europe? Or will it become a part of the new right's populist wave?

Comments

Popular posts from this blog

দুই বছর পর বিশ্ব ইজতেমা

কোভিড ১৯ মহামারি শেষ বলেছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন

রানি এলিজাবেথের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রির ও রাস্ট্রপতির শোক প্রকাশ